শ্রেণি : পঞ্চম বিষয় : বাংলা পাঠ ১৩ - পাখির মতো
Shiuly's Class Room
Aklima Shiuly
শ্রেণি : পঞ্চম
বিষয় : বাংলা
পাঠ ১৩ - পাখির মতো
আল মাহমুদ রচিত "পাখির মতো" কবিতাটি একটি শিশুর প্রকৃতির সান্নিধ্যে যাওয়ার তীব্র ব্যাকুলতা এবং তার স্বাধীন চেতনার এক অনবদ্য প্রকাশ। আগের ও নতুন ছবি মিলিয়ে পুরো কবিতাটির সহজ ব্যাখ্যা ও মূলভাব নিচে বুঝিয়ে দেওয়া হলো:
সম্পূর্ণ কবিতার লাইনের সরল ব্যাখ্যা
"আম্মা বলেন, পড়তে সোনা / আব্বা বলেন, মন দে।"
ব্যাখ্যা: মা আদর করে সন্তানকে ‘সোনা’ বলে পড়তে বসার তাগিদ দেন এবং বাবা পড়াশোনায় গভীরভাবে মনোযোগ দিতে বলেন। এটি সব সাধারণ পরিবারের একটি চিরচেনা দৃশ্য।
"পাঠে আমার মন বসে না / কাঁঠালচাঁপার গন্ধে।"
ব্যাখ্যা: কিন্তু চার দেয়ালের মাঝে বইয়ের পাতায় শিশুটির মন একদমই বসছে না। কারণ, ঘরের বাইরে থেকে কাঁঠালচাঁপা ফুলের তীব্র ও মিষ্টি সুবাস ভেসে এসে তাকে প্রতিনিয়ত প্রকৃতির দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে।
"আমার কেবল ইচ্ছে জাগে / নদীর কাছে থাকতে,"
ব্যাখ্যা: নিয়মতান্ত্রিক পড়ার চেয়ে শিশুটি মুক্ত বাতাসে ঘুরে বেড়াতে চায়। তার মন চায় কোনো এক নদীর তীরে গিয়ে বসে থাকতে এবং নদীর বয়ে চলা ও তার সৌন্দর্য উপভোগ করতে।
"বকুল ডালে লুকিয়ে থেকে / পাখির মতো ডাকতে।"
ব্যাখ্যা: তার ইচ্ছে করে বকুল গাছের ঘন পাতার আড়ালে নিজেকে লুকিয়ে ফেলতে এবং মুক্ত ডানাওয়ালা পাখির মতো নিজের মনের আনন্দে ডাকতে বা গান গাইতে।
"সবাই যখন ঘুমিয়ে পড়ে / কর্ণফুলীর কূলটায়,"
ব্যাখ্যা: রাতের বেলা যখন চারপাশ শান্ত হয়ে যায় এবং কর্ণফুলী নদীর তীরে সবাই গভীর ঘুমে মগ্ন থাকে, তখনো শিশুটির মন এক কাল্পনিক ও অপার্থিব জগতে ঘুরে বেড়ায়।
"দুধভরা ওই চাঁদের বাটি / ফেরেশতারা উল্টায়।"
ব্যাখ্যা: রাতের আকাশে পূর্ণিমার উজ্জ্বল চাঁদ দেখে শিশুর মনে হয় যেন সেটি একটি দুধভরা বাটি, আর স্বর্গের ফেরেশতারা যেন খেলার ছলে বা আনন্দের আতিশয্যে সেই বাটিটিকে আকাশে উল্টে দিয়ে চারদিকে চাঁদের আলো বা জ্যোৎস্না ছড়িয়ে দিয়েছে।
"তখন কেবল ভাবতে থাকি / কেমন করে উড়ব,"
ব্যাখ্যা: রাতের সেই শান্ত ও মায়াবী পরিবেশে জেগে থেকে শিশুটি শুধু কল্পনার ডানা মেলে ভাবে যে, সে কীভাবে পাখির মতো আকাশে ডানা মেলে উড়ে বেড়াবে।
"কেমন করে শহর ছেড়ে / সবুজ গাঁয়ে ঘুরব!"
ব্যাখ্যা: ইটের তৈরি এই যান্ত্রিক শহর ছেড়ে কীভাবে সে দূরে কোনো এক সবুজে ঘেরা শান্ত গ্রামে গিয়ে মুক্ত মনে ঘুরে বেড়াবে, সেই ভাবনায় সে বিভোর থাকে।
"তোমরা যখন শিখছ পড়া / মানুষ হওয়ার জন্য,"
ব্যাখ্যা: সমাজের চিরাচরিত নিয়ম অনুযায়ী বাকি সব ছেলেমেয়েরা যখন শুধু তথাকথিত ‘মানুষ’ হওয়ার জন্য দিনরাত বইয়ের পাতায় মুখ গুঁজে পড়াশোনা করছে,
"আমি না হয় পাখিই হব / পাখির মতো বন্য!"
ব্যাখ্যা: তখন শিশুটি প্রচলিত সেই নিয়মের বেড়াজাল ভাঙতে চায়। সে বলে, প্রথাগত মানুষ হওয়ার চেয়ে সে বরং প্রকৃতির বুকে ডানা মেলে দেওয়া এক স্বাধীন, মুক্ত এবং বন্য পাখি হতেই বেশি ভালোবাসবে।
কবিতার সামগ্রিক মূলভাব
এই কবিতাটি আসলে আমাদের নিয়মতান্ত্রিক ও যান্ত্রিক জীবনের সাথে শিশুর চিরন্তন ও মুক্ত মনের এক সুন্দর মনস্তাত্ত্বিক রূপ। কবিতাটিতে ফুল (কাঁঠালচাঁপা), নদী (কর্ণফুলী), চাঁদ এবং পাখি—এই উপাদানগুলো অবাধ স্বাধীনতার প্রতীক। বড়দের তৈরি করা পড়াশোনার কঠোর নিয়ম এবং শহরের বন্দিজীবন শিশুর চঞ্চল মনকে আটকে রাখতে পারে না। সে প্রকৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হতে চায় এবং খাঁচামুক্ত পাখির মতো স্বাধীনভাবে বাঁচতে চায়।
বইয়ে দেওয়া মূল শব্দার্থ
কর্ণফুলী — বাংলাদেশের চট্টগ্রাম অঞ্চলের একটি প্রধান ও বিখ্যাত নদীর নাম।
কাঁঠালচাঁপা — মিষ্টি সুবাস বা গন্ধযুক্ত হলুদ রঙের একধরনের ফুল।
দুধভরা ওই চাঁদের বাটি — পূর্ণিমার গোল ও উজ্জ্বল চাঁদকে বোঝানো হয়েছে (চাঁদের সাদা জোছনাকে কবি দুধের সাথে তুলনা করেছেন)।
বন্য — বুনো (যা বনে থাকে বা যা কোনো বাঁধন মানে না, এখানে স্বাধীন ও মুক্ত অর্থে ব্যবহৃত)।
কবিতার অন্যান্য শব্দের সহজ অর্থ
আম্মা — মা / জননী।
সোনা — আদর করে ডাকা সম্বোধন (স্নেহভাজন)।
আব্বা — বাবা / পিতা।
মন দে — মনোযোগ দেওয়া বা খেয়াল করা।
পাঠে — পড়াশোনায় বা বই পড়ার মাঝে।
মন বসে না — মনোযোগ আসে না বা ভালো লাগে না।
গন্ধে — সুবাসে বা ঘ্রাণে।
কেবল — শুধু / কেবলমাত্র।
ইচ্ছে — আকাঙ্ক্ষা বা মনের সাধ।
জাগে — তৈরি হয় বা উদয় হয়।
কূলটায় — তীরে বা পাড়ে (নদীর পাড়)।
ফেরেশতারা — আল্লাহর বা ঈশ্বরের দূত (স্বর্গীয় দূত)।
উল্টায় — উপুড় করে বা উল্টো করে দেওয়া।
ভাবতে থাকি — চিন্তা করতে থাকি বা কল্পনা করি।
উড়ব — ডানায় ভর করে আকাশে ভেসে চলা।
গাঁয়ে — গ্রামে (সবুজ পল্লীতে)।
ঘুরব — ভ্রমণ করা বা বেড়ানো।
মানুষ হওয়ার জন্য — এখানে সমাজের চোখে সফল বা সুপ্রতিষ্ঠিত হওয়ার পড়াশোনাকে বোঝানো হয়েছে।
না হয় — বিকল্প হিসেবে (তাতেই ক্ষতি নেই অর্থে)।
১. শব্দার্থ ও এক কথায় উত্তর (জ্ঞানমূলক প্রশ্ন)
প্রশ্ন: 'কর্ণফুলী' কী?
উত্তর: কর্ণফুলী হলো বাংলাদেশের চট্টগ্রাম অঞ্চলের একটি প্রধান ও বিখ্যাত নদীর নাম।
প্রশ্ন: কবি পূর্ণিমার চাঁদকে কিসের সাথে তুলনা করেছেন?
উত্তর: কবি পূর্ণিমার চাঁদকে 'দুধভরা বাটি'র সাথে তুলনা করেছেন।
প্রশ্ন: চাঁদের বাটি কারা উল্টায় বলে শিশুর মনে হয়?
উত্তর: ফেরেশতারা চাঁদের বাটি উল্টায় বলে শিশুর মনে হয়।
প্রশ্ন: কোন ফুলের গন্ধে শিশুর পাঠে মন বসে না?
উত্তর: কাঁঠালচাঁপা ফুলের গন্ধে শিশুর পাঠে মন বসে না।
প্রশ্ন: শিশুটি কোথায় লুকিয়ে থেকে পাখির মতো ডাকতে চায়?
উত্তর: শিশুটি বকুল গাছের ডালে পাতার আড়ালে লুকিয়ে থেকে পাখির মতো ডাকতে চায়।
প্রশ্ন: 'বন্য' শব্দের অর্থ কী?
উত্তর: 'বন্য' শব্দের অর্থ বুনো বা যা কোনো বাঁধন মানে না (এখানে স্বাধীন অর্থে ব্যবহৃত)।
প্রশ্ন: শহর ছেড়ে শিশুটি কোথায় ঘুরতে চায়?
উত্তর: শহর ছেড়ে শিশুটি সবুজ গাঁয়ে বা গ্রামে ঘুরতে চায়।
১. মা-বাবা ও পড়াশোনা সংক্রান্ত প্রশ্ন
প্রশ্ন: আম্মা সন্তানকে আদর করে কী বলে ডাকেন?
উত্তর: সোনা।
প্রশ্ন: আব্বা সন্তানকে কী করতে বলেন?
উত্তর: পড়াশোনায় মন দিতে বলেন।
প্রশ্ন: শিশুর মন কোথায় বসে না?
উত্তর: পাঠে (বা পড়াশোনায়)।
প্রশ্ন: অন্য সবাই কেন পড়া শিখছে?
উত্তর: মানুষ হওয়ার জন্য।
২. প্রকৃতি ও ফুল-গাছ সংক্রান্ত প্রশ্ন
প্রশ্ন: কোন ফুলের সুবাসে শিশুর পড়ার মন চঞ্চল হয়ে ওঠে?
উত্তর: কাঁঠালচাঁপা ফুল।
প্রশ্ন: কাঁঠালচাঁপা ফুলের রঙ কেমন হয়?
উত্তর: হলুদ রঙের।
প্রশ্ন: শিশুটির কোন গাছের ডালে লুকানোর ইচ্ছে জাগে?
উত্তর: বকুল গাছের ডালে।
প্রশ্ন: বকুল ডালে লুকিয়ে শিশুটি কার মতো ডাকতে চায়?
উত্তর: পাখির মতো।
৩. নদী, স্থান ও রাত সংক্রান্ত প্রশ্ন
প্রশ্ন: শিশুটির কার কাছে গিয়ে থাকতে ইচ্ছে করে?
উত্তর: নদীর কাছে।
প্রশ্ন: কবিতায় কোন নির্দিষ্ট নদীর নাম উল্লেখ আছে?
উত্তর: কর্ণফুলী নদী।
প্রশ্ন: কর্ণফুলী নদীটি বাংলাদেশের কোন অঞ্চলে অবস্থিত?
উত্তর: চট্টগ্রাম অঞ্চলে।
প্রশ্ন: সবাই কখন কর্ণফুলীর কূলে ঘুমিয়ে পড়ে?
উত্তর: রাতের বেলা।
প্রশ্ন: শিশুটি কোন জায়গা ছেড়ে চলে যেতে চায়?
উত্তর: যান্ত্রিক শহর ছেড়ে।
প্রশ্ন: শহর ছেড়ে শিশুটি কোথায় ঘুরে বেড়াতে চায়?
উত্তর: সবুজ গাঁয়ে (গ্রামে)।
৪. চাঁদ, কল্পনা ও শেষাংশ সংক্রান্ত প্রশ্ন
প্রশ্ন: কবি পূর্ণিমার চাঁদকে কিসের সাথে তুলনা করেছেন?
উত্তর: দুধভরা বাটির সাথে।
প্রশ্ন: শিশুর কল্পনা অনুযায়ী কারা চাঁদের বাটি উল্টে দেয়?
উত্তর: ফেরেশতারা।
প্রশ্ন: রাতে জেগে শিশুটি কী ওড়ার কথা ভাবতে থাকে?
উত্তর: কেমন করে আকাশে উড়বে।
প্রশ্ন: কবি শেষ পর্যন্ত মানুষের বদলে কী হতে চেয়েছেন?
উত্তর: পাখি।
প্রশ্ন: কবি কেমন পাখি হতে চেয়েছেন?
উত্তর: পাখির মতো বন্য (স্বাধীন)।
৫. ব্যাকরণ ও কবি পরিচিতি সংক্রান্ত প্রশ্ন
প্রশ্ন: "পাখির মতো" কবিতাটির কবির নাম কী?
উত্তর: আল মাহমুদ।
"কুঁলটায়" শব্দের অর্থ কী?
উত্তর: তীরে বা পাড়ে।
"গাঁ" শব্দের অর্থ কী?
উত্তর: গ্রাম।
"বন্য" শব্দের অর্থ কী?
উত্তর: বুনো বা স্বাধীন।
কবিতায় 'পাখি' কিসের প্রতীক হিসেবে এসেছে?
উত্তর: অবাধ স্বাধীনতার প্রতীক।
২. সংক্ষিপ্ত ও অনুধাবনমূলক প্রশ্ন (ব্যাখ্যামূলক)
প্রশ্ন: "পাঠে আমার মন বসে না"— শিশুর পাঠে মন বসে না কেন?
উত্তর: ঘরের বাইরে প্রকৃতির রূপ ও কাঁঠালচাঁপা ফুলের তীব্র মিষ্টি সুবাস চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। প্রকৃতির এই হাতছানি ও অবাধ স্বাধীনতার আকর্ষণের কারণেই শিশুর মন বইয়ের পাতায় আটকে থাকে না বা পাঠে মন বসে না।
প্রশ্ন: "দুধভরা ওই চাঁদের বাটি ফেরেশতারা উল্টায়"— লাইনটি দ্বারা কী বোঝানো হয়েছে?
উত্তর: রাতের আকাশে গোল ও উজ্জ্বল পূর্ণিমার চাঁদ দেখে শিশুর মনে হয় যেন সেটি একটি দুধভরা বাটি। আর রাতের মায়াবী আলো বা জ্যোৎস্না দেখে তার মনে হয়, স্বর্গের ফেরেশতারা যেন খেলার ছলে সেই বাটিটি আকাশে উল্টে দিয়ে চারদিকে আলো ছড়িয়ে দিয়েছে। এটি শিশুর একটি সুন্দর কল্পনা।
প্রশ্ন: সবাই যখন ঘুমিয়ে পড়ে তখন শিশুটি কী ভাবতে থাকে?
উত্তর: সবাই যখন রাতে কর্ণফুলী নদীর তীরে গভীর ঘুমে মগ্ন থাকে, তখন শিশুটি জেগে জেগে কল্পনার ডানা মেলে। সে ভাবতে থাকে কীভাবে পাখির মতো আকাশে ডানা মেলে উড়ে বেড়ানো যায় এবং এই ইটের তৈরি যান্ত্রিক শহর ছেড়ে দূরের কোনো সবুজ গ্রামে ঘুরে বেড়ানো যায়।
প্রশ্ন: "আমি না হয় পাখিই হব, পাখির মতো বন্য!"— কবি কেন পাখি হতে চেয়েছেন?
উত্তর: সমাজের চিরাচরিত নিয়ম অনুযায়ী সবাই পড়াশোনা করে তথাকথিত 'মানুষ' হতে চায়, যা শিশুকে চার দেয়ালের মাঝে বন্দি করে রাখে। শিশুটি এই নিয়মের বেড়াজাল ও শহরের বন্দিজীবন থেকে মুক্তি চায়। সে প্রকৃতির কোলে মুক্ত, স্বাধীন ও খাঁচামুক্ত পাখির মতো বুনো জীবন কাটাতে চায় বলেই পাখি হতে চেয়েছে।
৩. শূন্যস্থান পূরণ (পরীক্ষার উপযোগী)
প্রশ্ন: আম্মা বলেন, পড়তে ___________। (উত্তর: সোনা)
প্রশ্ন: পাঠে আমার মন বসে না ___________ গন্ধে। (উত্তর: কাঁঠালচাঁপার)
প্রশ্ন: সবাই যখন ঘুমিয়ে পড়ে ___________ কূলটায়। (উত্তর: কর্ণফুলীর)
প্রশ্ন: তোমরা যখন শিখছ পড়া ___________ হওয়ার জন্য। (উত্তর: মানুষ)
প্রশ্ন: আমি না হয় পাখিই হব, পাখির মতো ___________! (উত্তর: বন্য)
৪. যোগ্যতাভিত্তিক বা বড় প্রশ্ন (রচনামূলক)
প্রশ্ন: "পাখির মতো" কবিতার মূলভাব নিজের ভাষায় লেখো।
উত্তর: "পাখির মতো" কবিতাটিতে শিশুর চঞ্চল মন এবং প্রকৃতির প্রতি তার গভীর ভালোবাসার কথা বলা হয়েছে। মা-বাবা চান সন্তান মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করুক। কিন্তু প্রকৃতির রূপ, কাঁঠালচাঁপা ফুলের গন্ধ, নদীর ডাক এবং পাখির গান শিশুকে ঘরের বাইরে টেনে নিয়ে যায়। রাতে যখন সবাই ঘুমিয়ে পড়ে, তখনো শিশুটি শহর ছেড়ে সবুজ গ্রামে উড়ে যাওয়ার কল্পনা করে। সমাজের প্রথাগত নিয়মে বন্দি হয়ে 'মানুষ' হওয়ার চেয়ে, প্রকৃতির বুকে ডানা মেলে দেওয়া এক স্বাধীন ও মুক্ত 'পাখি' হওয়াই শিশুর প্রধান আকাঙ্ক্ষা।
আল মাহমুদ রচিত "পাখির মতো" অধ্যায়ের সকল গুরুত্বপূর্ণ তথ্য, ভেতরের ভাবার্থ এবং ব্যাকরণগত উপাদান একসাথে নিচে সাজিয়ে দেওয়া হলো।
১. কবি পরিচিতি (মূল তথ্য)
কবির নাম: আল মাহমুদ।
জন্ম ও জন্মস্থান: ১১ই জুলাই ১৯৩৬, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার মৌড়াইল গ্রামে।
বিখ্যাত সাহিত্যকর্ম: লোক লোকান্তর, কালের কলস, সোনালী কাবিন (কাব্যগ্রন্থ)।
কাব্যিক বৈশিষ্ট্য: তাঁর কবিতায় গ্রামীণ জীবন, লোকজ উপাদান এবং প্রকৃতির রূপ অসাধারণভাবে ফুটে উঠেছে।
মৃত্যু: ১৫ই ফেব্রুয়ারি ২০১৯।
২. কবিতার মূল চরিত্র ও তার মনস্তত্ত্ব
মূল চরিত্র: একটি ছোট ছেলে (শিশু)।
চরিত্রের বৈশিষ্ট্য: চঞ্চল, প্রকৃতিপ্রেমী, স্বাধীনচেতা এবং কল্পনাপ্রবণ।
দ্বন্দ্ব বা সমস্যা: মা-বাবার দেওয়া পড়াশোনার সামাজিক নিয়মের সাথে তার মুক্ত মনের ইচ্ছা ও প্রকৃতির সুবাসের এক মিষ্টি লড়াই বা দ্বন্দ্ব।
৩. কবিতার উপাদান ও তাদের প্রতীকী অর্থ
কবিতাটিতে কবি শিশুর মনের ভাব প্রকাশ করতে ৪টি মূল উপাদান ব্যবহার করেছেন:
কাঁঠালচাঁপা ফুল: পড়ার টেবিল থেকে মনকে চঞ্চল করে তোলার বা প্রকৃতির দিকে আকর্ষণের প্রতীক।
নদী (কর্ণফুলী): বন্ধনহীনতা, গভীরতা এবং দূর সীমানায় হারিয়ে যাওয়ার প্রতীক।
পূর্ণিমার চাঁদ (দুধভরা বাটি): শিশুর মায়াবী ও অলৌকিক কল্পনার প্রতীক।
বন্য পাখি: কোনো নিয়ম বা খাঁচায় বন্দি না থাকা অবাধ স্বাধীনতার চূড়ান্ত প্রতীক।
৪. কবিতার প্রতিটি লাইনের অন্তর্নিহিত অর্থ (সংক্ষেপে)
মা-বাবার আদেশ: মা আদর করে 'সোনা' বলেন এবং বাবা 'মন দিতে' বলেন— এটি শিশুর ওপর সামাজিক দায়িত্ব ও প্রত্যাশার চাপ।
চাঁদের বাটি ও ফেরেশতা: এটি রাতের গভীরতায় শিশুর রূপকথার মতো এক সুন্দর কল্পনা। সে জ্যোৎস্নার আলোকে ফেরেশতাদের উল্টে দেওয়া দুধের সাথে তুলনা করেছে।
শহর বনাম গ্রাম: শহর মানে চার দেয়ালের বন্দিদশা, আর সবুজ গাঁ (গ্রাম) মানে ডানা মেলে ওড়ার জায়গা।
মানুষ বনাম পাখি: সমাজে সবাই মুখস্থ বিদ্যা শিখে বড় চাকরি বা সফল 'মানুষ' হতে চায়। কিন্তু শিশুটি কোনো কৃত্রিমতার মাঝে না গিয়ে প্রকৃতির মাঝে এক 'বন্য পাখি' হয়ে বাঁচতে চায়।
৫. অধ্যায়ের সম্পূর্ণ শব্দার্থ ও টীকা
কর্ণফুলী — বাংলাদেশের চট্টগ্রাম অঞ্চলের প্রধান এবং অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ নদী।
কাঁঠালচাঁপা — কড়া ও মিষ্টি সুবাসযুক্ত হলুদ রঙের ফুল।
দুধভরা ওই চাঁদের বাটি — পূর্ণিমার গোল চাঁদ এবং তার চারদিকে ছড়িয়ে পড়া সাদা জোছনা।
বন্য — বুনো বা স্বাধীন (যেখানে কোনো সামাজিক নিয়মের খাঁচা নেই)।
কূলটায় — নদীর পাড়ে বা তীরে।
গাঁয়ে — গ্রামে বা পল্লীতে।
পাঠ — অধ্যয়ন বা পড়ালেখা।
কেবল — শুধু মাত্র।
৬. অধ্যায়ের ব্যাকরণ ও ভাষারূপ (গুরুত্বপূর্ণ)
বিপরীত শব্দ:
মন ➡️ অমনোযোগ
ঘুমিয়ে ➡️ জেগে
ছেড়ে ➡️ ধরে
মানুষ ➡️ অমানুষ
বন্য ➡️ গৃহপালিত / পোষা
দিন ➡️ রাত
ইচ্ছা ➡️ অনিচ্ছা
সমার্থক শব্দ:
আম্মা ➡️ মা, জননী, মাতা
আব্বা ➡️ বাবা, পিতা, জনক
নদী ➡️ তটিনী, তরঙ্গিণী
চাঁদ ➡️ শশী, সুধাকর, চন্দ্র
পাখি ➡️ খগ, বিহঙ্গ, পক্ষী
গাঁ ➡️ গ্রাম, পল্লী
ক্রিয়ার কাল (কবিতার চলিত রূপ):
বলিতেছেন (সাধু) ➡️ বলছেন (চলিত)
বসিয়াছে (সাধু) ➡️ বসেছে (চলিত)
ঘুমিয়া (সাধু) ➡️ ঘুমিয়ে (চলিত)
উড়িব (সাধু) ➡️ উড়ব (চলিত)
ঘুরিব (সাধু) ➡️ ঘুরব (চলিত)
৭. গুরুত্বপূর্ণ যুক্তবর্ণ বিশ্লেষণ
ন্ধ = ন্ + ধ (শব্দ: গন্ধ, অন্ধকার)
ম্ম = ম্ + ম (শব্দ: আম্মা, সম্মান)
ব্ব = ব্ + ব (শব্দ: আব্বা, আব্বাসী)
চ্ছ = চ্ + ছ (শব্দ: ইচ্ছে, স্বচ্ছ)
র্ন = র (রেফ) + ন (শব্দ: কর্ণফুলী, ঝর্ণা)
স্ত = স্ + ত (শব্দ: ফেরেশতা, রাস্তা, ব্যস্ত)